ফ্রিল্যান্সিং আসলে কি? এবং ফ্রিল্যান্সিং কিভাবে করতে হয়?
আমরা সোশ্যাল মিডিয়াতে, পেপারে, টিভিতে, পাঠ্যবইতে ফ্রিল্যান্সিং সম্পর্কে অনেক কিছু দেখি এবং বুঝতে পারি এটি খুবই জনপ্রিয় একটি বিষয়। কিন্তু ফ্রিল্যান্সিং এ কি করতে হয় এবং কিভাবে করতে হয় তার পুরোপুরি ধারণা পাওয়া যায় না।
এই ব্লগে ফ্রিল্যান্সিং কি এবং কিভাবে করতে হয় তার একটি সম্পূর্ণ বেসিক ধারনা দেয়া হয়েছে।
ফ্রিল্যান্সিং হলো দেশে বসেই বিদেশী কোম্পানিতে চাকরি। এখন প্রশ্ন হলো, দেশে বসে আমরা বিদেশী কোম্পানিতে কেন চাকরি করবো বা বিদেশী কোম্পানি গুলো কেন আমাদের কে দিয়ে কাজ করাবে? এবং এটি কিভাবে করবো?
মনে করুন, আপনি দেশে আছেন এবং আপনার একজন বন্ধু বিদেশে আছে। আপনি তার সাথে ফেস টু ফেস ভিডিও কলে কথা বলতে পারেন যেকোনো ছবি অথবা ফাইল শেয়ার করতে পারেন। অতএব যদি বিদেশে আপনার কোনো বস থাকে তাহলে আপনি তার সাথেও কথা বলতে পারবেন এবং যেকোনো অফিসিয়াল ফাইল শেয়ার করতে পারবেন।
যদি আপনি বাইরের দেশে থাকা কোনো বেক্তির সাথে সরাসরি ভিডিও কলে কথা বলতে পারেন এবং যেকোনো ফাইল শেয়ার করতে পারেন তাহলে বিদেশি যেকোনো কোম্পানিতে ঘরে বসেই যেকোনো কাজ করা সম্ভব।
অতএব দেশে বসে বিদেশী যেকোনো কোম্পানির বস/বায়ার এর সাথে সরাসরি কথোপকথন এবং অফিশিয়াল ডকুমেন্টস শেয়ার এর মাধ্যমে কাজ করে টাকা উপার্জন করাকে ফ্রিল্যান্সিং বলে।
ফ্রিল্যান্সিং এ কি কি কাজ করা যায়?
আপনি ফ্রিল্যান্সিং এর মাধ্যমে যে কোন কাজ করতে পারেবন: সেটা হতে পারে অফিশিয়াল যেকোনো জব, ব্যাঙ্ক জব, একাউন্টেন্ট এর কোনো জব। অথবা IT জব যেমন: কম্পিউটার অপারেটর, ফেইসবুক অ্যাডমিন, ইউটিউব অ্যাডমিন, গ্রাফিক ডিজাইনার, এবং ওয়েবসাইট তৈরি করার মতো বিভিন্ন IT সংক্রান্ত কাজ।
কিভাবে এই ফ্রিল্যান্সিং কাজ বা চাকরি করবেন?
আপনারা ৩ ভাবে ফ্রিল্যান্সিং করতে পারেন: চুক্তি ভিত্তিক, মাসিক, এবং ঘন্টা হিসেবে।
চুক্তি ভিত্তিক ফ্রিল্যান্সিং:
ধরুন বায়ার আপনাকে ১ সপ্তার মধ্যে একটি গ্রাফিক্স ডিজাইন তৈরি করে দিতে বললো। আপনি কাজটি নিলেন ১ সপ্তার মধ্যে কাজটি করে বায়ারকে জমা দিলেন এবং সে আপনাকে এই কাজের জন্য পেমেন্ট করে দিলো। এটি হচ্ছে চুক্তি ভিত্তিক কাজ।
মাসিক ফ্রিল্যান্সিং:
মনে করুন আপনি একটি কোম্পানিতে পার্মানেন্টলি জব করছেন। ওই কোম্পানির নির্দেশ মতো ডেইলি অফিস টাইম এ আপনি কাজ করছেন এবং কোম্পানি আপনাকে মাসিক বেতন দিচ্ছে। আপনি এইভাবেও ফ্রিল্যান্সিং করতে পারবেন।
জেনে রাখা ভালো – আমেরিকা বা বিভিন্ন বাইরের দেশ গুলোতে যেকোনো কোম্পানির মাসিক বেতন সর্বনিম্ন ৫০০$ হয়ে থাকে যা বাংলাদেশী টাকায় প্রায় ৫১০০০ টাকা। অতএব আপনি ঘরে বসেই ফ্রিল্যান্সিং এর মাধ্যমে প্রতি মাসে ৫০,০০০ বা তারও বেশি টাকা আয় করতে পারবেন।
ঘন্টা হিসেবে ফ্রিল্যান্সিং:
ধরুন কোনো কোম্পানির কাজের জন্য আপনাকে এপয়েন্ট করা হলো এবং ওনারা আপনাকে প্রতি মাসে অথবা প্রতি সপ্তাহে আপনার কাজের জন্য পেমেন্ট করবে, কিন্তু পেমেন্ট এর হিসাবটি হবে ঘন্টা ভিত্তিক। মানে, আপনি একদিনে যেই কয় ঘন্টা কাজ করবেন তার হিসেবে।
যেমন, আপনি ১ দিনে ৬ ঘন্টা করে কাজ করছেন। তাহলে ৭ দিনে আপনার কাজের হিসাব হবে ৪২ ঘন্টা। এই ৪২ ঘন্টা হিসাব করে কোম্পানি আপনাকে প্রতি সপ্তাহে পেমেন্ট করবে। যদি মাসিক হয় তাহলে (৩০ x ৬=১৮০) আপনার কাজের হিসাব হবে ৩০ দিনে ১৮০ ঘন্টা এবং কোম্পানি আপনাকে এটি প্রতি মাসে পেমেন্ট করবে।
জেনে রাখা ভালো – আমেরিকা বা বিভিন্ন বাইরের দেশ গুলোতে প্রত্যেক ঘন্টার সর্বনিম্ন বেতন ৩$ যা বাংলাদেশী টাকায় ৩০০ টাকা। অতএব ঘরে বসেই ফ্রিল্যান্সিং এর মাধ্যমে যদি আপনি কোনো কোম্পানিতে ৭ দিনে ৪২ ঘন্টা কাজ করেন তবে আপনার সাপ্তাহিক বেতন ৪২ x ৩০০=১২৬০০ টাকা।
আপনি আপনার ফ্রিল্যান্সিং এর মাধ্যমে আয় করা বেতন কিভাবে পাবেন?
এক্ষেত্রে বাংলাদেশ সরকার এবং বাংলাদেশ ব্যাংক ফ্রিল্যান্সিং এর মাধ্যমে দেশে বসেই আয় করার জন্য কিছু সহজ ব্যবস্থা তৈরি করে দিয়েছেন। যেমন, আপনার যদি বাংলাদেশের যেকোনো সরকারি বা বেসরকারি ব্যাংক এ একাউন্ট থাকে তবে বাইরের যেকোনো দেশ থেকে খুব সহজেই আপনার একাউন্ট এ ফ্রিল্যান্সিং এর স্যালারি সরাসরি ট্রান্সফার হয়ে যাবে।
আপনি যে কোম্পানিতে কাজ করবেন সেই কোম্পানির বস কে আপনার ব্যাংক একাউন্ট দিয়ে দিতে হবে এবং সে আপনার একাউন্ট এ স্যালারি ট্রান্সফার করে দেবে।
ফ্রিল্যান্সিং এ বিদেশী কোম্পানির লাভ কি এবং আমাদের লাভ কি?
ফ্রিল্যান্সিং এ বিদেশি কোম্পানির লাভ:
আমেরিকার কোনো কোম্পানিতে সেই দেশের নাগরিকদের কাজের জন্য সর্বনিম্ন বেতন ৩০০০$, এর কমে বেতন দেয়া যায় না। কিন্তু ওই কোম্পানি যখন আপনাকে অথবা বাংলাদেশ এর কাউকে দিয়ে কাজ করাবে তখন আপনাকে দেয়ার জন্য সর্বনিম্ন বেতন ৫০০$। অতএব, এতে কোম্পানির বিশাল একটা সাশ্রয় হবে। এটা হচ্ছে তাদের লাভ।
ফ্রিল্যান্সিং এ আমাদের লাভ:
এই ক্ষেত্রে আমাদের লাভ হচ্ছে, আমরা বেশি বেতনে কাজ করতে পারি। আমরা বাংলাদেশে একটি কোম্পানিতে কাজ করলে যেইখানে মাসে ৩০০০০ হাজার আয় করি, সেইখানে আমেরিকার একটি কোম্পানিতে কাজ করে মাসে ৫০০০০ অথবা ঘন্টা হিসেবে কাজ করে প্রত্যেক সপ্তাহে ২০০০০ আয় করা সম্ভব।
ফ্রিল্যান্সিং এ চাকরি কিভাবে পাবো?
আমরা ফ্রিল্যান্সিং এর কাজ গুলো ৩ ভাবে পেতে পারি :
১. জব সাইট / মার্কেটপ্লেস
২. কোনো কোম্পানি থেকে সরাসরি বা ডাইরেক্ট
৩. চাকরি পাওয়া ছাড়া কাজ
ফ্রিল্যান্সিং জব সাইট :
জব সাইট বা মার্কেটপ্লেস ২ ধরণের হয়ে থাকে-
জেনারেল জব সাইট:
আমরা বাংলাদেশে কোনো চাকরি খুঁজতে গেলে বাংলাদেশী জব সাইট bdjobs.com এ ভিজিট করি। এই সাইট গুলোকে জেনেরাল জব সাইট বলে। এর মাধ্যমে আমরা বিভিন্ন কোম্পানির চাকরির পোস্টগুলো দেখতে পারি এবং ওই কোম্পানিতে যোগাযোগ করতে পারি। ঠিক তেমনভাবেই প্রত্যেকটি দেশেরই এক একটি পপুলার জব সাইট আছে আমরা একটি জেনেরাল জব সাইট থেকে ওই দেশের চাকরি বিজ্ঞপ্তির পোস্টগুলো দেখতে পারি এবং সেখানে এপ্লাই করতে পারি।
বাংলাদেশে সবচেয়ে পপুলার জব সাইট যেমন bdjobs.com, তেমন আমেরিকার একটি পপুলার জব সাইট হচ্ছে Craigslist.org আমরা এই সাইট এর কোম্পানি পোস্ট গুলোর মাধ্যমে তাদের সাথে যোগাযোগ করে অথবা এপ্লাই করে ফ্রিল্যান্সিং এর কাজ শুরু করতে পারি।
আপনি যদি জার্মানির কোনো কোম্পানিতে চাকরি করতে চান তাহলে Jobs Site In Germany লিখে গুগল এ সার্চ করলে ওই দেশের জব সাইট গুলো পেয়ে যাবেন। এরপর আপনি যেকোনো কোম্পানির পোস্ট এর মাধ্যমে ওই কোম্পানির ওয়েবসাইট এ গিয়ে চাকরির জন্য এপ্লাই করতে পারবেন।
ফ্রিল্যান্সিং জব সাইট :
ফ্রিল্যান্সিং এর চাকরি পাওয়ার জন্য স্পেশাল কিছু জব সাইট আছে যেখানে শুধুমাত্র ফ্রিল্যান্সিং এর জবগুলোই প্রোভাইড করা হয়। যেমন: UP work এবং Fiverr. এই সাইট গুলোতে শুধুমাত্র ফ্রিল্যান্সিং এর জবগুলো পোস্ট করা হয়। এই সাইট গুলোতে আমরা ফ্রিল্যান্সিং একাউন্ট তৈরি করে জব এ এপ্লাই করতে পারি। এবং বিভিন্ন ফ্রিল্যান্সিং রিলেটেড প্রফেশনাল কাজ শেখা থাকলে জবে এপ্লাই করে আয় করতে পারি।
জেনারেল জব সাইট গুলোতে ২ ধরণের জব পাওয়া যায় – নির্দিষ্ট জায়গায় অর্থাৎ ওই দেশে গিয়ে চাকরি করা এবং ফ্রিল্যান্সিং জব। কিন্তু ফ্রিল্যান্সিং জব সাইট গুলোতে শুধুমাত্র ফ্রিল্যান্সিং এর জবগুলোই পাওয়া যায় যেগুলো দেশে বসেই করা সম্ভব।
কোনো কোম্পানিতে সরাসরি বা ডাইরেক্ট জব:
মনে করুন আপনি আমেরিকার একটি ফ্যাশন কোম্পানিতে চাকরি করবেন, তাহলে আপনি fashion house in USA লিখে গুগল এ সার্চ করলে আমেরিকার বিভিন্ন ফ্যাশন কোম্পানি ওয়েবসাইট বের হবে। আপনি তাদের ওয়েবসাইট এ গিয়ে ফেইসবুক পেজ, ইমেইল এবং নম্বর এর মাধ্যমে তাদের সাথে কন্টাক্ট করতে পারেন এবং আপনার CV দিতে পারেন। এইভাবে আমরা যেকোনো কোম্পানিতে সরাসরি জব পেতে পারি।
চাকরি পাওয়া ছাড়া কাজ:
অনেক অনেক কোম্পানি আছে যারা আপনাকে কাজ করার সুযোগ দিবে, আপনাকে পার্মানেন্টলি এপয়েন্ট করবে না। কিন্তু তাদের সাথে কাজ করার সুযোগ সবসমই ওপেন থাকবে, আপনি যেকোনো সময় গিয়ে তাদের কোম্পানির ওয়েবসাইট এ রেজিস্ট্রেশন করে কাজ শুরু করতে পারেবন। আপনি তাদেরকে যতটুকু কাজ করে দিতে পারবেন ঠিক ততটুকু তারা আপনাকে পেমেন্ট করবে।
এরকম অনেক গুলো কোম্পানি কাজ দেয় যেমন: Amazon
Amazon হচ্ছে একটি ই-কমার্স কোম্পানি যারা পুরো পৃথিবীতে প্রোডাক্ট সেল করে। আপনি Amazon এর ওয়েবসাইট এ গিয়ে একজন এফিলিয়েট হিসেবে রেজিস্ট্রেশন করে কাজ শুরু করতে পারবেন।
চাকরি পাওয়া ছাড়া আমরা আরও অনেক অনেক কাজ করতে পারি যেমন: CPA Marketing, Affiliates Marketing, YouTube AdSense, Google AdSense.
ফ্রিল্যান্সিং এ কি পরিমান কাজ পাওয়া যায়?
পৃথিবীতে ১০০ টির ও বেশি ফ্রিল্যান্সিং এর স্পেশালাইজড মার্কেটপ্লেস/জব সাইট রয়েছে। এবং প্রত্যেকটি জব সাইট এ হাজার হাজার কাজ পাওয়া যায়।
Upwork একটি জব সাইট, আমরা যদি এই ওয়েবসাইট এ গিয়ে শুধু মাত্র SEO জব সার্চ করে দেখি তাহলে আমরা দেখতে পাবো শুধুমাত্র SEO নিয়েই ১০,০০০ এর বেশি কাজ রয়েছে।
তাহলে বুঝতেই পারছেন, একটি সাইট এ যদি একটি বিষয়ে ১০,০০০ কাজ থাকে তাহলে এমন ১০০ টি জব সাইটে কি পরিমান কাজ থাকতে পারে।
কিন্তু বিষয় হচ্ছে, আপনি যদি কাজ গুলো করতে না পারেন তবে কোনো লাভ নেই। এর জন্য আপনাকে কাজ শিখতে হবে। এর সম্পর্কে ধারণা নিতে হবে একদম শূন্য থেকে। এবং নিজেকে প্রস্তুত করতে হবে।
এখন প্রশ্ন হচ্ছে, এই ফ্রিল্যান্সিং কাজ গুলোতে কম্পিটিশন কেমন?
বিশ্বের প্রত্যেকটি দেশ বিভিন্ন ধরণের ফ্রিল্যান্সিং এর কাজ গুলো দিয়ে থাকে।
এবং বাংলাদেশ, ইন্ডিয়া, পাকিস্তান, ফিলিপিন এই দেশ গুলো ফ্রিল্যান্সিং এর কাজ বেশি করে থাকে।
আগে মানুষ এর ফ্রিল্যান্সিং সম্পর্কে তেমন কোনো ধারণা ছিলোনা, তাই এর প্রতিযোগিতাও অনেক কম ছিল কিন্তু যত দিন যাচ্ছে এটি মানুষের কাছে ততই জনপ্রিয় হয়ে উঠছে।
তাই বলা যায়, দিন দিন ফ্রিল্যান্সিং কাজের কম্পিটিশন অনেক বেড়ে যাচ্ছে। আর তাই আপনার উচিত হবে খুবই গুরুত্ব দিয়ে কাজ শিখে বিশেষ ভাবে নিজেকে প্রস্তুত করা যদি আপনি ফ্রিল্যান্সিং কাজ করতে চান।
তবে একটি কথা সবসমই মনে রাখতে হবে, কাজ জানা ফ্রীলান্সার অনেক কম, কারণ সবাই সঠিক গাইডলাইন্স অনুযায়ী কাজ শেখেনা বা কাজ করেনা।
যে কেউ মার্কেটপ্লেস এ এসে একাউন্ট তৈরি করতে পারবে বা কাজের জন্য এপ্লাই করতে পারবে কিন্তু যার কোন দক্ষতা নেই সে কখনই কাজ করতে পারবেনা, যতক্ষণ সে সঠিক ভাবে কাজ না শিখবে।
আমাদের সর্বশেষ ভাবনা ফ্রিল্যান্সিং সম্পর্কে
আপনি যদি সঠিক গাইডলাইন্স মেনে কাজ শিখে নিজেকে প্রস্তুত করে কাজ শুরু করেন তাহলে আপনার কম্পিটিশন অনেক কমে যাবে। কাজ ১০% অথবা ৫০% শিখলে হবেনা। আপনাকে সঠিক নিয়মে ১০০% কাজই শিখতে হবে।